হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তায় কি মোতায়েন হচ্ছে পাকিস্তান নৌবাহিনী?
আপলোড সময় :
১৪-০৩-২০২৬ ০৭:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৪-০৩-২০২৬ ০৭:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন
হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তায় কি মোতায়েন হচ্ছে পাকিস্তান নৌবাহিনী?
নিজস্ব প্রতিবেদক
পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো বর্তমানে পাকিস্তানের নিজস্ব সামুদ্রিক রুটে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এসকর্ট (সুরক্ষা দিয়ে সঙ্গে নিয়ে চলা) করছে। তবে যুদ্ধের কারণে অস্থির পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করছে না—এ কথা বুধবার এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
এই ব্যাখ্যা এসেছে কয়েকদিন পর, যখন ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশন (আইএসআই) ঘোষণা দেয় যে ৯ মার্চ অপারেশন মাহফুজ উল বাহার শুরু করা হয়েছে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো জাতীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। এই অভিযানে পাকিস্তান নেশনাল শিপিং করপোরেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজকে এসকর্ট করেছে, যার একটি ঘোষণার কিছুক্ষণ পর করাচি বন্দরে পৌঁছায়।
হরমুজ প্রণালী হলো একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা পারস্য উপসাগরকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশ্বের দৈনিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর সংঘাত তীব্র হওয়ার কারণে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড করপোরেশন কার্যত এই প্রণালী দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। তারা জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং এই পথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে হুমকি দিয়েছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা গেছে, প্রণালীর কাছাকাছি এলাকায় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন বাহিনী ইরানের মাইন পাতা জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি কমে গেছে।
এই পরিস্থিতির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন যদি এই পথ বন্ধ থাকে তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারে, যা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অনেক জাহাজকে তখন কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হবে, এতে পরিবহন সময় কয়েক সপ্তাহ বেড়ে যাবে এবং খরচও বাড়বে।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে হয় এবং অধিকাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে দেশটি ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে—কিছু অঞ্চলে স্কুল বন্ধ এবং কর্মসপ্তাহ পরিবর্তনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান নৌবাহিনী করাচি থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং করাচি থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত রুটে এসকর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হনমুজ প্রণালীতে সরাসরি জড়িত না হয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক রুট রক্ষা করতে চায়।
পাকিস্তান নেশন্যাল শিপিং করপোরেশনের জাহাজগুলো, যেগুলো জরুরি জ্বালানি বহন করে, পাকিস্তান নৌবাহিনীর আধুনিক ফ্রিগেট ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের এসকর্ট পাচ্ছে। সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে এমন কিছু ছবি প্রকাশ করেছে যেখানে যুদ্ধজাহাজকে বাণিজ্যিক জাহাজের পাশে চলতে দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সসহ কিছু দেশ ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বৃহত্তর অঞ্চলে এসকর্ট মিশনে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো উচ্চ ঝুঁকির কারণে নিয়মিতভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে চাইছে না।
পাকিস্তানের কৌশল মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক—সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে না গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটগুলো নিরাপদ রাখা।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এর প্রভাবও বড়, কারণ উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্পখাতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ চলাচল পুনরুদ্ধার করাই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কমানোর প্রধান শর্ত। কিন্তু চলমান সামরিক উত্তেজনা থাকায় দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে অপারেশন মাহফুজ উল বাহারের মতো অভিযান পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে, যাতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা যায়।
বুধবার কর্মকর্তার এই বক্তব্য আবারও নিশ্চিত করেছে যে পাকিস্তানের নৌ অভিযান সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সীমাবদ্ধ এবং সংঘাতের মূল এলাকায় জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে মোতায়েন পরিবর্তিত হতে পারে, তবে মূল লক্ষ্য থাকবে পাকিস্তানের বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : NewsUpload
কমেন্ট বক্স